October 11, 2026, 9:16 pm

৷ ড. আমানুর আমান ////
ডেঙ্গু এখন আর বাংলাদেশের মৌসুমি একটি রোগমাত্র নয়; এটি ক্রমেই পরিণত হচ্ছে একটি দীর্ঘস্থায়ী জনস্বাস্থ্য সংকটে। একসময় বর্ষা এলেই ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ত, শীত এলে পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে যেত। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীর সীমানা ছাড়িয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে। আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে, হাসপাতালগুলোতে চাপ তৈরি হচ্ছে, আর প্রতিবছরই আমরা যেন নতুন করে একই প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছি—এত প্রস্তুতি, এত অর্থব্যয়, এত প্রচারণার পরও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আসছে না কেন?
১১ অক্টোবর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালে দেশে ডেঙ্গুতে ৯৯ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০৩। গত ২৪ ঘণ্টায়ই ২ হাজার ১৯৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ দৈনিক সংখ্যা। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একজন কর্মজীবী মানুষ, একজন সন্তান, একজন মা কিংবা একজন বাবা।
ডেঙ্গুর ইতিবৃত্ত: পুরোনো রোগ, বদলে যাওয়া বাস্তবতা
বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস নতুন নয়। কিন্তু গত এক দশকে রোগটির চরিত্র ও বিস্তার নাটকীয়ভাবে বদলেছে। ২০২৩ সালে দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহতম প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। সে বছর তিন লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হন এবং ১,৭০০-এর বেশি মানুষ মারা যান। এরপর ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।
ডেঙ্গু ভাইরাস বহন করে এডিস মশা। কিন্তু সমস্যাটি শুধু মশার উপস্থিতি নয়; মশার বংশবিস্তারের পরিবেশ তৈরি হওয়াটাই মূল বিষয়। জমে থাকা পানি, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র, প্লাস্টিকের বর্জ্য, ছাদে জমে থাকা পানি, অপরিষ্কার ড্রেন—সবই এডিস মশার প্রজননক্ষেত্র হতে পারে।
অর্থাৎ ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে যুদ্ধটি মূলত একটি পরিবেশগত ও নগর ব্যবস্থাপনার যুদ্ধ।
বাংলাদেশে এত প্রকোপ কেন?
প্রথম কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং আর্দ্রতা এডিস মশার বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করছে। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও দেখা গেছে, বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বড় অংশ বর্ষাকালকেন্দ্রিক এবং তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের পরিবর্তনের সঙ্গে সংক্রমণের সম্পর্ক রয়েছে।
দ্বিতীয় কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণ। ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে একই জায়গায় বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নির্মাণকাজ, জলাবদ্ধতা, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং অনিয়মিত পানি সরবরাহ। WHO-ও বাংলাদেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতির সঙ্গে দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জনঘনত্ব, পানি-স্যানিটেশন ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যাকে যুক্ত করেছে।
তৃতীয় কারণ মানুষের চলাচল। আগে ডেঙ্গুকে অনেকটা ঢাকাকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে দেখা হতো। এখন রাজধানী থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষের ব্যাপক যাতায়াতের কারণে ভাইরাসের বিস্তারও সহজ হচ্ছে।
চতুর্থ কারণ আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন। বাসার বারান্দায় পড়ে থাকা টব, ছাদে জমে থাকা পানি, ফেলে দেওয়া বোতল কিংবা নির্মাণস্থলের ছোট জলাধার—এসবকে আমরা তুচ্ছ বিষয় মনে করি। অথচ ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে এই তুচ্ছ বিষয়গুলোই বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
সরকারের দুর্বলতা কোথায়?
সরকারের সমালোচনা করতে হলে প্রথমেই একটি বিষয় স্বীকার করতে হবে—ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। WHO-ও বলছে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্বাস্থ্য খাতের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার, নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং জনগণের সমন্বিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে সরকারের দায় নেই। বরং সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো সমন্বয় তৈরি করা এবং সেই সমন্বয়কে কার্যকরভাবে মাঠে নামানো।
এখানেই আমাদের বড় দুর্বলতা।
প্রথমত, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে অনেক সময় প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা দেখা যায়। রোগীর সংখ্যা বাড়ার পর মশক নিধন অভিযান জোরদার হয়। অথচ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হওয়া উচিত প্রাদুর্ভাবের আগেই সম্ভাব্য প্রজননক্ষেত্র শনাক্ত ও ধ্বংস করা।
দ্বিতীয়ত, মশক নিয়ন্ত্রণে অর্থ ব্যয়ের সঙ্গে ফলাফলের সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন আছে। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন গত ১১ বছরে মশক নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে বলে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবু প্রতিবছর ডেঙ্গু ফিরে আসছে। তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—সমস্যা কি অর্থের ঘাটতি, নাকি অর্থ ব্যবহারের কৌশল ও জবাবদিহির ঘাটতি?
তৃতীয়ত, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে—এই পুরোনো ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। মশা মারার পাশাপাশি কোথায় মশা জন্মাচ্ছে, কেন জন্মাচ্ছে এবং কার দায়িত্বে সেই স্থান পরিষ্কার হবে—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জরুরি।
চতুর্থত, ঢাকার বাইরে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা আরও দুর্বল। অনেক পৌরসভা ও স্থানীয় প্রশাসনের বছরব্যাপী মশা পর্যবেক্ষণ ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংসের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কিন্তু তার আগের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা দুর্বল থেকে যায়।
শুধু জনগণকে দোষ দিলে হবে না
ডেঙ্গু নিয়ে সরকারি-বেসরকারি প্রচারণায় প্রায়ই বলা হয়—“সচেতন হোন”, “বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখুন”, “জমে থাকা পানি ফেলে দিন”। এসব অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু জনগণকে শুধু দায়ী করে রাষ্ট্র তার দায়িত্ব এড়াতে পারে না।
একজন নাগরিক যদি নিয়মিত ময়লা ফেলার জায়গা না পান, তাহলে তাকে শুধু অসচেতন বলা যায় না। কোনো নির্মাণস্থলে দিনের পর দিন পানি জমে থাকলে শুধু বাড়ির মালিককে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে দায়িত্ব শেষ করা যায় না। কোনো ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার না হলে তার দায় নাগরিকের নয়।
অতএব সচেতনতা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা—দুটিকে পাশাপাশি চলতে হবে।
তাহলে করণীয় কী?
প্রথম কাজ হতে হবে জাতীয় ডেঙ্গু আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা চালু করা। কোন এলাকায় মশার ঘনত্ব বাড়ছে, কোথায় বৃষ্টিপাত বেশি হয়েছে, কোথায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে—এসব তথ্য একত্র করে আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশেষজ্ঞরাও এমন জাতীয় early-warning system-এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
দ্বিতীয়ত, মশক নিয়ন্ত্রণের অর্থ ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও ফলাফলভিত্তিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কত টাকা খরচ হলো—এটি যথেষ্ট নয়; কতগুলো প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হলো, মশার ঘনত্ব কতটা কমল, রোগীর সংখ্যা কতটা কমল—তারও হিসাব দিতে হবে।
তৃতীয়ত, সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকারকে বছরব্যাপী মশক নিয়ন্ত্রণে যেতে হবে। ডেঙ্গু শুধু সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের সমস্যা নয়। মশা জন্মানোর পরিবেশ তৈরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নিতে হবে।
চতুর্থত, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও নার্স, পর্যাপ্ত শয্যা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং ডেঙ্গুর জটিলতা মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
সবশেষে দরকার নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণ। নিজের বাড়ি পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি প্রতিবেশীর ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা দেখলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো, সামাজিকভাবে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং স্কুল-কলেজে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি।
ডেঙ্গু আসলে মশার বিরুদ্ধে যুদ্ধের চেয়েও বড় কিছু। এটি আমাদের নগর ব্যবস্থাপনা, পরিবেশনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা, স্থানীয় সরকার এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ—সবকিছুর পরীক্ষা।
প্রশ্নটি তাই শুধু “মশা কতটা মারা গেল?”—এতটুকু নয়। প্রশ্ন হওয়া উচিত, “কেন মশা জন্মানোর পরিবেশ বারবার তৈরি হচ্ছে?”
এই প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সাফল্য আসবে না।
আজ ৩০৩ মৃত্যু হয়তো আগামীকাল আরও বাড়বে, আবার কোনো এক বছর কমতেও পারে। কিন্তু কেবল সংখ্যা কমে গেলেই আমরা সফল হব না। সফলতা তখনই আসবে, যখন ডেঙ্গু নিয়ে প্রতিবছর আতঙ্কিত হতে হবে না; যখন প্রাদুর্ভাবের আগে প্রশাসন প্রস্তুত থাকবে; যখন হাসপাতাল রোগীর চাপে নুয়ে পড়বে না; এবং যখন একটি পরিবারের প্রিয় মানুষকে একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগে হারাতে হবে না।
ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সরকারের দায়িত্ব আছে, জনগণেরও দায়িত্ব আছে। কিন্তু নেতৃত্ব দিতে হবে রাষ্ট্রকেই। কারণ সচেতন নাগরিক প্রয়োজন, কিন্তু সচেতন রাষ্ট্র ছাড়া জনস্বাস্থ্য সুরক্ষিত হয় না।
ড. আমানুর আমান, সম্পাদক প্রকাশক ও মুদ্রাকর, দৈনিক কুষ্টিয়া ও দি কুষ্টিয়া টাইমস